পশ্চিম বাংলায় বিজেপি এখন ও তৃণমূল কে অপসারিত করে ক্ষমতায় আসতে পারে নি, যদি ও সম্পূর্ণ উত্তর ভারতে বিজেপির বিজয় পতাকা! গত লোকসভায় পশ্চিম বাংলায় বিজেপির ভোট অনেক বেড়েছিলো এবং সেই কারণে ৪২ এর মধ্যে ১৮ টা লোকসভা সিট্ পাওয়া গিয়েছিলো। আশা করা গিয়েছিলো যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসবে কিন্তু সেইটা বাস্তবায়িত হয় নি. ভারতীয় জনতা পার্টি ৭৭ তা সিট্ পেয়ে বিধানসভায় প্রমুখ প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে অবশ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ক্ষমতায় আসতে হলে বিজেপি কে এখন ও অনেক কাজ করতে হবে এবং তার জন্য সমস্যা গুলো কে আগে ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে. সাথে সাথে তার সমাধান জেনে সেই হিসাবে কাজ করতে হবে. আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে সফলতা প্রাপ্ত করতে হলে ভারতীয় জনতা পার্টি কে বিচার করতে হবে কি মূল সমস্যা তা কোথায় এবং কিভাবে সেই সমস্যা গুলোর সমাধান হতে পারে। এই সমস্যাগুলি কে বিভিন্ন ভাবে দেখতে এবং বিশ্লেষণ করতে হবে যেমন সাংস্কৃতিক এবং ধার্মিক, রাজনৈতিক এবং সংগঠনিক।
বাংলার সমস্যা
সাংস্কৃতিক এবং ধার্মিক
1. পশ্চিম বাংলা শেষ উত্তর ভারতের ধরনের ধার্মিক নয়। মৌলিকভাবে শক্তি-পূজক বাঙালী সমাজের জন্য কালী পূজা, দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা ধার্মিক থেকে বেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে ও অনেক অপসংস্কৃতি মূলক বিকৃতি এসেছে যেটা সর্ববিদিত।
2. বাংলায় বৈষ্ণব সমাজ শক্তি-পূজকদের তুলনায় অল্পসংখ্যক। উপরন্তু বাংলার বৈষ্ণব সমাজ মুখ্যতঃ কৃষ্ণ পূজক। এই কারণে শ্রীরামের নাম পশ্চিম বাংলায় কম প্রভাবশালী।
3. এক সময় বাঙালি ভাষায় লেখা কৃত্তিবাস রামায়ণ ঘরে -ঘরে জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু এখন সেই রকম নয় ।
4. এক সময় রাজস্থানের মারবাড়ি সমাজ বাংলায় আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী ছিল এবং এটি বিজেপির এক শক্তিশালী এবং মৌল সমর্থক শ্রেণী। এখন এই সমাজটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিহীন হয়েছে।
5. 'বাঙালী ভদ্রলোক' আজকের রাজনীতিতে উপেক্ষিত তবে এটি একটি বড় এবং সম্ভ্রান্ত শ্রেণী। এই শ্রেণীও বিজেপির সাথে যোগ হতে দ্বিধা গ্রস্ত।
6. বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের অখিল ভারতীয় নেতৃত্ব মূলতঃ হিন্দি ভাষী। সাধারণ বাঙালী তাদের থেকে ঐভাবে অন্তরঙ্গতা অনুভব করেন না।
সমাধান
1. বাঙালি সমাজকে ধার্মিক সংস্কৃতির সাথে যোগ করতে সতত প্রয়াস করতে হবে। শক্তি-পূজার স্বরূপে ধর্মবাদ আনতে হবে। এতে অপসংস্কৃতি দূর করতে হবে।
2. বৈষ্ণব পরম্পরার কীর্তন, বাউল, শ্যামা সঙ্গীত ইত্যাদির সঙ্গে রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি ইত্যাদির পরম্পরাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে ।
3. বাংলায় আবৃত্তি, কবিতা পাঠ, আলোচনা চক্র, বাদবিবাদ প্রতিযোগিতা ইত্যাদির পুরানো পরম্পরাকে এর সঙ্গে যোগ করতে হবে।
4. কৃত্তিবাস রামায়ণ কে ঘরে ঘরে পৌছাতে হবে এবং সেই রামায়ণের সার্বজনীক পাঠের ব্যবস্থা করতে হবে.
5. মারওয়াড়ি (রাজস্থানি) / গুজরাটি সমাজ বিজেপির মূল সমর্থক শ্রেণী এবং প্রভাবশালী সমাজ। এদেরকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে এবং অন্য প্রবাসীদের, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ডের লোকদের সাথে সংযোগ করতে হবে।
6. 'বাঙালী ভদ্রলোক' সংস্কৃতি-প্রেমী। প্যারা 2 এর সাংস্কৃতিক উপায়ে তাদের কে বিজেপির সাথে যোগ করতে হবে। এছাড়াও, রামকৃষ্ণ পরমহংস, বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজি সুভাষ ইত্যাদি বাংলার গৌরবের মাধ্যমে তাদের সুষুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করতে হবে।
7. ভাষার দূরত্ব কম করতে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশ করতে হবে, যাদের মুলে বাঙালিয়ানা যুক্ত, কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিচারের সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের দ্বারা প্রেরিত।
বাংলার সমস্যা
রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক
1. বাংলার রাজনীতি অনেক বছর ধরে "পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি" হয়ে আসছে। নীচের স্তরে কর্মীরা কোনও লাভ না পেলে কাজ করতে চায় না। আগে কমিউনিস্ট এবং এখন তৃণমূল এই "পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির " জোর দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব মজবুত করেছে।
2. রাজনৈতিক নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় স্তর থেকে আসা টাকা নিচে পৌঁছায় না, এই রকম অভিযোগ উঠতে থাকে। এই কারণে জমিনি স্তরের কর্মীরা অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হয় যায়.
3. জমিনি কর্মীরা ভয়ের রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত। উপর থেকে তাদের পূর্ণ রাজনৈতিক সাহায্য প্রাপ্ত না হওয়ায় তাদের বিজেপি থেকে পৃথক হতে হয়।
সম্ভাবিত সমাধান
1. "পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি" কে কিভাবে মোকাবিলা করা যায় সেই দিকে বিশেষ ভাবে চিন্তা ভাবনা করতে হবে. দীর্ঘস্থায়ী রাজনীতি তে নিঃস্বার্থ দেশসেবার ভাব জাগানোর জন্য কাজ করা যায়, কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতি, অন্ততঃ পক্ষে পশ্চিমবাংলায়, লাভের রাজনীতি তে টিকে আছে.
2. রাজনীতিক শুচিতার খেয়াল রেখে উপরের স্তরে এমন নেতৃত্ব দেওয়া যায় যাতে জমিনি কর্মীদের পর্য্যন্ত অর্থের প্রবাহ হয়। সংগঠনে শক্তির বিকেন্দ্রীকরণ এবং কর্মীদের সশক্তিকরণ প্রয়োজন।
3. হিংসা থেকে ভয়গ্রস্ত কর্মীদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষা দিতে হবে। তাদের জন্য প্রশাসনিক/আইনি সুরক্ষা এবং বড় নেতাদের সাথে তাত্ক্ষণিক সহায় প্রয়োজন।
No comments:
Post a Comment